ফ্যশনের কথা বাদ দাও, ঢেকে চলাতেই মুক্তি।


লেখক : 55muslim

এমনকি অমুসলিম মেয়েদেরও পর্দা করা উচিত…..মুসলিমদের নিকাব ফ্রান্সে একটা গরম রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নিয়েছে – কিন্তু স্টেলা হোয়াইট বুঝতে পারেন না এ নিয়ে এত কথা বলার কি আছে? ইংলন্ডের কেন্টে বসবাসকারী এই ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ান সম্পূর্ণ ঢেকে চলার আনন্দ ব্যাখ্যা করেন:

অবমুক্ত পশ্চিমাদের কাছে হিজাব অথবা নিকাব হচ্ছে নারীত্বের উপর আরোপিত এক কলঙ্ক। এটা হচ্ছে নারীসত্ত্বাকে পিষে মারার এবং দাসত্বের শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত করার একটা প্রতীক – যা কিনা নারীকে এমন এক নিষ্ক্রিয় মাংসপিন্ডে পরিণত করে, যাকে কেবল তার স্বামীর জন্য খাবার কিনতে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ইংরেজ নারীরা যখন এরকম সব-ঢেকে-চলা কোন নারীর মুখোমুখি হন, তখন তারা তার দিকে এক করুণা ও দুঃখের দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন। তাদের জন্য নিকাব হচ্ছে এক জীবিত মরণ। ফ্রেঞ্চ কর্তৃপক্ষ, যারা স্কুলসমূহে হিজাব নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গীটাও হয়তো এরকমই যে: স্বল্পবয়সী কোন মেয়েকেই যেন তার তারুণ্যের মাথায় অবদমনের এই বোঝা বয়ে বেড়াতে না হয়।

তথাপি আমি সহ অনেকের কাছেই নিকাবটা বলপ্রয়োগের কোন অস্ত্র নয়, বরং একটা মুক্তির উপায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনোই এত স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিনি, যা আমি নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেকে রাখলে বোধ করি। “আমি এমন একটা সংস্কৃতি/কৃষ্টির প্রোপাগান্ডা করছি, যা আমার মগজ ধোলাই করেছে” – আপনারা এমন একটা অনুমান করার আগেই আমি বলে নিচ্ছি যে, আমি মুসলিম নই বরং একজন ক্যাথলিক। আমি রহস্য-ঘেরা প্রাচ্য থেকে আসিনি বরং আমি নীরস কেন্টের অধিবাসী, ৩২ বছর বয়স্কা একজন নারী। আমি জবুথবু কোন সেকেলে নারী নই, বরং আমার অনেকগুলো আধুনিক গুণের ভিতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছে যে, আমি একজন নৃত্যশিল্পী ও চটকদার মডেলও। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের তিনজন হচ্ছে ”স্ট্রিপার”। মুসলিম পুরুষদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল, কিন্তু তাদের কেউই কখনো আমাকে হিজাব পরতে বলেনি। সত্যি বলতে কি তারা আমার এই আচরণে বিব্রত বোধ করেছে। আমার অতীত জীবনে এমন কেউ নেই, যে আমাকে নিকাব পরতে বাধ্য করেছে। আমি ঢেকে চলি, কেননা, আমি তা খুবই পছন্দ করি। আমার এবং বাইরের কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীর মাঝখানে একটা দেয়াল সৃষ্টি করে হিজাব আমাকে যে প্রাইভেসীটুকু দেয়, আমি তা খুবই উপভোগ করি, বিশেষত লন্ডনে। নিকাবের আড়ালে আমি খুবই শান্তি অনুভব করি। একদিকে উৎসুক পথচারীদের দৃষ্টির তীর আমি যেমন অনুভব করি না, আবার অন্যদিকে ট্রাফিক, শব্দ এবং ভিড় আমার কাছে কম বিরক্তিকর মনে হয়। এমনকি হাঁটতে হাঁটতেও আমি নিজের নিরাপদ জগতে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারি। আর বাস্তবে যেটা হয়, কেউ অযাচিতভাবে আমার গায়ে পড়ে কথা বলবে – এরকম অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকি।

হিজাব একটা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বটে। লন্ডনের অধিকাংশ পথচারীর মতই প্রত্যেক গৃহহীন ব্যক্তিকে দেখলেই, তাকে অর্থ সাহায্য করার মত অর্থ আমার নেই। কিন্তু তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার ঠিকই খারাপ লাগে এবং নিজেকে অপরাধী মনে হয়। হিজাবের ভিতরে আমি সেই অস্বস্তিটা লুকাতে পারি। আমি চোর-ছ্যাঁচোড়দের কাছ থেকেও বেশ নিরাপদ থাকি। তারা হয়তো আমার দিকে তাকিয়ে ভাবে, “অবৈধ অভিবাসী, এর পেছনে কষ্ট করে লাভ নেই।” হয়তো তারা এও ভাবে যে, আমার বড় ব্যাগের ভেতরে বড়জোর বাড়ীতে অপেক্ষা করা (সম্ভাব্য) ১৬ জন ছেলে-মেয়ের জন্য খুব সস্তা কিছু শাকসব্জি থাকবে।

হিজাব পরা অবস্থায় কেনাকাটাও আমার জন্য সস্তা হয়। মুসলিম দোকানীদের ক্ষুদ্র জনসংখ্যা সাধারণত দুই ধরনের দাম চেয়ে থাকে “আমাদের একজনের জন্যে” দামটা সাধারণত পশ্চিমাদের জন্য নির্ধারিত দামের চেয়ে কম হয়। আমি যখন পয়সা বাঁচিয়ে কিছু কিনতে চাই, তখন হিজাব-নিকাব পরে বাইরে যাই।
নিকাব পরার সবচেয়ে অদ্ভুত যে প্রভাবটা ল্ক্ষ্য করা যায় তা হচ্ছে এই যে, আপনি খুব স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন হয়ে যান এবং সাথে সাথেই আপনি একজন মুসলিম নারী যে সুযোগ সুবিধা ও সম্মান লাভ করে তাও লাভ করতে শুরু করেন। আমি যখন একটা মুসলিম দোকানে যাই, তখন একজন মুসলিম দোকানী আমাকে “আসসালামু আলাইকুম, আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” বলে ভদ্রভাবে সম্বোধন করবে। বাসে ওঠার মুখে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের মুসলিম পুরুষেরা একপাশে সরে গিয়ে বলবে, “আপনি আগে, বোন”।

লন্ডনের অফিস, বার ও ক্লাবগুলো ছোট স্কার্ট পরা ও স্ট্র্যাপযুক্ত স্যান্ডেল পরা ইংরেজ মেয়েতে ভর্তি যাদের অনেকেই ভালবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে। পশ্চিম যাদের প্রায়ই ঘৃণার চোখে দেখে, সেই সব হিজাবধারী নারীরা আসলে এই সমস্ত পশ্চিমা নারীদের প্রতি করুণা বোধ করে, যারা কিনা একজন পুরুষ পাওয়ার জন্য পঙ্গু করা হাইহিল পরে, ত্বক ঢেকে দেয়া মেকআপ পরে আর কঠোর ডায়েটিং করে নিজেদের ক্ষতিসাধন করে।

আমার ইরানীয়ান বন্ধু মোনা, একজন সফল ব্যবসায়ী মহিলা। সে প্রতিদিন নিখুঁত সাজে বাইরে যায়, রং করা নখ, পাটভাঙ্গা স্যুট ও সুচারু মেকআপ নিয়ে। সে বলে থাকে, “আমি যখন ইরানে ছিলাম তখন সবকিছু কত সহজ ছিল। – তুমি সকাল নয়টায় উঠে বড় কালো ঢাকা কাপড়টা গায়ে চড়াও, আর তারপর গাড়ীতে উঠে যাও। কিন্তু এখন আমাকে বাইরে যাবার আগে রোজ সকালে দুই-তিন ঘন্টা ধরে নিজেকে তৈরী করতে হয়।”

প্রায়শই হিজাবকে মুসলিম মৌলবাদীদের একটা ব্যাপার বলে পরিত্যাজ্য গণ্য করা হয়। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ান ঐতিহ্যে সেন্ট পল মেয়েদের মাথা ঢাকতে বলেন এবং ষাটের দশক পর্যন্ত ইংলিশ চার্চে কোন মেয়েকেই মাথায় টুপি এবং হাতমোজা ছাড়া দেখা যেতো না। অনেক ইংলিশ মহিলাই রাস্তায় একটা টুপি অথবা মাথায় একটা স্কার্ফ বেঁধে চলাফেরা করতো। এখনও হিন্দু এবং শিখ নারীদের কাছে আশা করা হয় যে, তারা সম্মান অথবা “ইজ্জত” পাবার জন্য মোটামুটিভাবে মাথাটা ঢেকেই রাখবে। আর সনাতনপন্থী ইহুদী মহিলারা ঐতিহ্যগতভাবে তাদের সত্যিকার চুলের উপরে পরচুলা পরিধান করে আসছেন – মূলত তাদের স্বামী ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে নিজের চুলকে আড়াল করতে। তথাপি আর সবাইকে বাদ দিয়ে কেবল মুসলিম মেয়েদেরই শিরস্ত্রাণের জন্য দুর্বল বা অত্যাচারিত বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

যারা হিজাব পরেন এবং যারা কট্টর নারীবাদী, আসলে এই দুই দলই সম্ভাব্য খলচরিত্র নন। সত্তরের দশকের শুরুতে যখন এক শ্রেণীর মেয়েরা তাদের চুল ছোট করে ফেললো, [আঁটো স্কার্টের পরিবর্তে] “ডাংরি” এবং [হাই হিলের পরিবর্তে] স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা কাপড়ের জুতা পরতে শুরু করলো, তারা আসলে তখন ফ্যাশনের জন্য দুর্ভোগকে প্রত্যাখ্যান করছিল এবং একই সাথে নষ্ট ও ছোঁকছোঁক করা পুরুষদের আকর্ষণ করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাকেও প্রত্যাখ্যান করছিলো। একইভাবে একজন মহিলা যখন হিজাব পরেন, তখন তিনি আসলে সৌন্দর্যের পশ্চিমা চটুল ধ্যান-ধারণার দাসত্ব ত্যাগ করে নিজের সম্মানজনক আত্মপরিচিতি সংরক্ষণ করতে পারেন।

গত সপ্তাহে একটা জনপ্রিয় ম্যাগাজিনে খুব করুণ একটা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে যার শিরোনাম ছিল “কি করে আপনার [নিজের] শরীরকে কম ঘৃণা করবেন”। আমি আমার আরব বন্ধু মালিকাকে প্রবন্ধটি দেখালাম, যে মাথা নাড়লো এবং বললো, “আমাদের সমাজে পুরুষরা যখন কোন মেয়েকে বিয়ে করে, তখন তারা এতই কৃতার্থ বোধ করে যে, তাকে তারা সুন্দরী রাজকুমারীর মত দেখে – তার আকৃতি-প্রকৃতি যাই হোক না কেন।”

হিজাবের ভিতরে থাকা মুসলিম মহিলারা তাদের ক্ষমতা ও মর্যাদা সন্বন্ধে জানেন। একজন মুসলিম পুরুষ আমাকে বলেছিলেন, “আমার স্ত্রী হচ্ছে একখন্ড সুন্দর হীরার মত। তুমি কি মহামূল্যবান একখন্ড হীরাকে আঁচড় লাগার জন্য অথবা চুরি হয়ে যাওয়ার জন্য রাস্তায় ফেলে রাখবে? না, তুমি বরং সেটাকে মখমলে মুড়ে রাখবে। আর একই রকমভাবে হিজাব আমার স্ত্রীকে সুরক্ষা দেয়, যে আমার কাছে যে কোন মণিমুক্তার চেয়ে মূল্যবান।”

অবশ্য কেউ যদি জোর করে আমার নিকাব সরাতে চায় অথবা পরাতেও চায় তবে আমি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবো। এমন একটা দেশে থাকার জন্য আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি, যেখানে আমার যা ইচ্ছা তাই করতে পারি। সব মেয়েরাই এমন সৌভাগ্যবান নয়। ব্যক্তিগতভাবে হিজাবের মাঝে আমি একধরনের “পথনির্দেশক ফেরেশতার” সন্ধান পেয়েছি। আমার মা অবশ্য পক্ষান্তরে দাবী করেন যে, আমি যেহেতু কেশবিন্যাস করতে চাই না সেহেতু আমি পর্দা করি।

Tagged , , , , ,

One thought on “ফ্যশনের কথা বাদ দাও, ঢেকে চলাতেই মুক্তি।

  1. অভ্রনীল বলেছেন:

    সুন্দর এই লেখাটি শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ! তবে সাথে মূল অনুবাদ লেখাটির লিংক দিয়ে দিলে ভালো হতো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: