আলেম সমাজ কি স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি?

লেখক : আনোয়ার বিন আঃ আজিজ

বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের সংগ্রামে কত মূল্যবান জীবন যে বিসর্জন দিতে হয়েছে, মাতৃভূমির জন্য কত স্বার্থের জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে- তার হিসেব নেই। দেশের স্বাধীনতা যেখানে বিপন্ন, মানবতা যেখানে পর্যদুস্ত, লাঞ্চিত ও বঞ্চিত- সেখানে দেশ-দেশবাসীর মান-সম্ভ্রম রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা সবার জন্য একান্ত প্রয়োজন। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন কোন লোক জালেমের পক্ষাবলমন্ব করতে পারে না। মাযলুমের সাহায্য করা ও তাদের পক্ষে কথা বলা- এটাই বিবেকের দাবি। তারপরও এদেশের আলেম সমাজ কেন পাকিস্তানীদের মৌন সমর্থন দিয়েছিলেন? এটা একটা বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নের জবাব পেতে বিভিন্ন তথ্যানুসন্ধান করত: আমরা জানতে পারি, যে সব আলেম পাকিস্তানের পক্ষে মৌন সমর্থন করেছিলেন তারা আদৌ পাকিস্তানের এ অত্যাচার, উৎপীড়ন ও নিপীড়নকে মেনে নেননি। কার্যতঃ তারা শুধু দেশ বিভক্তির বিপক্ষে ছিলেন । নতুবা আমরা দেখতে পাই, পাকিস্তানীদের পক্ষে সমর্থনকারী আলেম সমাজ যেমন ছিলেন, তেমনি মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়েছেন, ময়দানে যুদ্ধ করেছেন- এমন ওলামাগণ ছিলেন বহুলাংশে বেশি।
যেমন মাওলানা ইমদাদুল হক, আড়াইহাজার থানার কমান্ডার মরহুম শামছুল হকের (সাবেক এমপি) অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে আমি যখন লালবাগ মাদ্রাসার ছাত্র, যুদ্ধ শুরু হলে মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। আমি হাফেজ্জী হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম এ যুদ্ধে আমাদের ভূমিকা কী হবে?
হুজুর বললেন, অবশ্যই জালেমদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। তার এ কথায় আমি পাকিস্তানীদের জুলুমের প্রতিবাদের প্রেরণা পাই এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে এদেশের মানুষকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধকরণে অনেক আলেম ওলামাও কাজ করেছেন। তাদের মাঝে শায়খুল হাদীস কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, প্রিন্সিপাল, মালিবাগ মাদ্রাসা, শায়খুল হাদীস মরহুম তাজাম্মুল আলী, সিলেট, মাওলানা আবুল হাসান যশোরী, ময়মনসিংহের মাওলানা আরিফ রব্বানী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
যা-ই হোক, বাংলা স্বাধীনতার পিছনে আলেম-ওলামাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারপরও সবাই আলেমদেরকে স্বাধীনতা বিরোধী মনে করেন কেন? এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার আবদুল জলিলের কথাটি প্রনিধানযোগ্য। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও হাফেজ্জী হুজুরের মত লোকের শিষ্যত্ব বরণ করলেন কেন? তিনি সরল অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন- হাফেজ্জী হুজুর কখনো রাজাকার ছিলেন না। একাত্তরের যুদ্ধ আমরা জালেমদের বিরুদ্ধে করেছি, ইসলামের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের বাম রাজনীতিকরা একটি বিশেষ দলের চরিত্রের উপর বিচার করে আলেমদের রাজাকার আখ্যায়িত করে, নতুবা একাত্তরে এদেশের আলেমরা রাজাকার ছিলেন না। আল-বদর, আশ্‌-শামসে কেবল বিশেষ একটি দলের বড় নেতারাই ছিল। নিজেদের দল বড় করে দেখানোর জন্য অনেক আলেম-ওলামাদের নামও ব্যবহার করেছে। তাছাড়া সেসময় প্রচার মাধ্যমগুলো হয়তো পাক সরকারের সমর্থক, অথবা বামদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী আলেমদের কণ্ঠ সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছেনি। পাকিস্তান সরকারের সমর্থক পত্রিকাগুলো প্রচার করেছে- এদেশের আলেম সমাজ পাকিস্তানের পক্ষে। যদ্দরুন জনমানসে আলেমদের ব্যাপারে নিন্দার ঝড় উঠে, যা অদ্যবধিও কিছু না কিছু বিদ্যমান।
দ্বিতীয় আরেকটি কারণ হলো- সেক্যুলার রাজনীতি যারা করেন তারা আলেমদের থেকে দূরে থাকার কারণে এবং অন্যদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে কিছু আলেমের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তাদের স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে থাকেন। অথচ আদৌ এর কোন যৌক্তিকতা নেই।

Tagged ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: